বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে এক বর্ণাঢ্য ও সংগ্রামী অধ্যায়ের নাম বেগম খালেদা জিয়া। একজন সাধারণ গৃহবধূ থেকে দেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী এবং অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতৃত্বে উঠে আসার গল্পটি যেমন ঘটনাবহুল, তেমনি রোমাঞ্চকর।
১৯৮২ সালের ৩ জানুয়ারি বিএনপির প্রাথমিক সদস্যপদ গ্রহণের মধ্য দিয়ে যে পথচলা শুরু হয়েছিল, তা আজ ৪১ বছর অতিক্রম করেছে।স্বামীর মৃত্যুর পর অনেকটা পরিস্থিতির অনিবার্যতায় রাজনীতিতে আসেন তিনি। জিয়াউর রহমানের হাতে গড়া দল বিএনপি যখন অস্তিত্ব সংকটে, তখন দলের হাল ধরেন খালেদা জিয়া।
১৯৮৩ সালে জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি এবং ১৯৮৪ সালে চেয়ারপারসনের দায়িত্ব নিয়ে তিনি রাজপথে নামেন। শুরুতেই তাঁকে মুখোমুখি হতে হয় সামরিক শাসক হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের কঠোর শাসনের।
স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলনে দীর্ঘ নয় বছর রাজপথে আপসহীন ভূমিকা পালন করেন তিনি। এই সময়ে বারবার গৃহবন্দি ও গ্রেপ্তারের শিকার হলেও তিনি নির্বাচনের নামে কোনো প্রহসনে অংশ নিতে অস্বীকৃতি জানান।
তাঁর এই অনমনীয় মনোভাবই তাঁকে সাধারণ মানুষের কাছে ‘আপসহীন নেত্রী’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করে এবং নব্বইয়ের গণঅভ্যুত্থানে তিনি প্রধান চালিকাশক্তি হয়ে ওঠেন।১৯৯১ সালের নির্বাচনে জয়ী হয়ে তিনি বাংলাদেশের প্রথম নারী প্রধানমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। তাঁর আমলেই দেশে রাষ্ট্রপতি শাসিত সরকার ব্যবস্থা থেকে সংসদীয় গণতন্ত্রে ফিরে আসে বাংলাদেশ।
নারী শিক্ষা অবৈতনিক করা এবং মেয়েদের জন্য উপবৃত্তি চালু করার মতো যুগান্তকারী সব পদক্ষেপ তাঁর হাত ধরেই বাস্তবায়িত হয়েছে, যা নারী ক্ষমতায়নে বড় ভূমিকা রাখে।রাজনীতিতে তাঁর সাফল্যের গ্রাফও ঈর্ষণীয়।
তিনি তাঁর রাজনৈতিক জীবনে অংশগ্রহণ করা পাঁচটি সংসদীয় নির্বাচনের প্রতিটিতেই জয়লাভ করেছেন এবং মোট ২৩টি আসনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে কোনোটিতেই পরাজিত হননি।
২০০১ সালে চারদলীয় জোটের নেতৃত্ব দিয়ে তিনি দুই-তৃতীয়াংশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে পুনরায় দেশের প্রধানমন্ত্রী নির্বাচিত হন।তবে ২০০৭ সালের ১/১১-এর পটপরিবর্তনের পর থেকে তাঁর রাজনীতিতে কঠিন সময় শুরু হয়। ওয়ান-ইলেভেন সরকারের সময় গ্রেপ্তার হওয়া এবং পরবর্তীতে ২০১৮ সালের ৮ ফেব্রুয়ারি দুর্নীতির মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে কারাগারে যাওয়া—সব মিলিয়ে তিনি এক দীর্ঘ ও কঠিন সময় পার করছেন।
অসুস্থতা ও আইনি জটিলতায় বর্তমানে সক্রিয় রাজনীতি থেকে কিছুটা দূরে থাকলেও দলের নেতাকর্মীদের কাছে তিনি এখনো ঐক্যের প্রতীক। ৪১ বছরের এই দীর্ঘ যাত্রায় চড়াই-উতরাই পেরিয়ে খালেদা জিয়া আজ বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসের অবিচ্ছেদ্য অংশে পরিণত হয়েছেন।